জ্বালানি তেলের দাম একশ ডলার ছাড়িয়ে

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, শঙ্কা বাড়ল দীর্ঘায়িত যুদ্ধের

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন সৈয়দ মোজতবা হোসেইনি খামেনি। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী হোসেইনি খামেনির দ্বিতীয় পুত্র তিনি।

মোজতবা খামেনির নির্বাচন ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রবল সামরিক চাপের মধ্যেও ইরানের ক্ষমতা কাঠামো পিছু হটার পথে হাঁটছে না; বরং শাসন ব্যবস্থা দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠন করে প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘোষণা ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃঢ়তা ও অনমনীয়তারই বার্তা। অর্থাৎ ইরান এ যুদ্ধকে শুধু সামরিক সংঘাত হিসেবে নয়, বরং শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার অস্তিত্বগত লড়াই হিসেবেও দেখছে। ফলে সংঘাত দ্রুত থেমে যাওয়ার যে সামান্য আশা ছিল, মোজতবার দায়িত্ব গ্রহণে সেটি আরো ক্ষীণ হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এ রাজনৈতিক সংকেতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। পরে কিছুটা কমলেও তা এখনো ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদের মতে, এ পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি তেল সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। তাদের আশঙ্কা, সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে জ্বালানি বাজারের ধাক্কা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। নতুন নেতৃত্বের ঘোষণার পর যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান আরো দূরে সরে গেলে এ চাপ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার প্রশ্নটি দ্রুত রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতা কাঠামো তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। এ সিদ্ধান্ত শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ধারাবাহিকতাই নিশ্চিত করেনি, বরং যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের পথও আরো জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবাকে বেছে নেয়ার মধ্য দিয়ে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা আপস নয়, বরং প্রতিশোধ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের পথেই রয়েছে।

মিডলইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ‘এত বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে, এত ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন যেন শেষ পর্যন্ত শুধু ৮৬ বছর বয়সী একজন নেতাকে হত্যা করা। খামেনির জায়গায় যদি একই ধরনের কঠোর অবস্থানে থাকা তার ছেলে ক্ষমতায় আসে—তাহলে এটা প্রকৃতপক্ষে ওয়াশিংটনকে কৌশলগতভাবে অপমান করা।’

মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নিয়ে ইরান ‘বড় ভুল’ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এনবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, মোজতবা খামেনিকে বেছে নিয়ে তারা বড় ভুল করেছে।’ এর আগে তাকে ‘হালকা ওজনের’ ব্যক্তি বলেও উল্লেখ ট্রাম্প।

মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। ফলে তার নেতৃত্বে ইরানের ক্ষমতা কাঠামো আগের মতোই শক্ত অবস্থানে থাকবে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে তাকে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন এবং ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি তুলেছেন। এ অবস্থান যুদ্ধের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেখা যায়, নতুন নেতার প্রতি সমর্থন জানাতে দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে জনসমাবেশ হয়েছে। তেহরান, ইসফাহানসহ বড় শহরগুলোতে মানুষ ইরানের পতাকা ও নিহত আলী খামেনির ছবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। আলী খামেনির মৃত্যুর আগে ইরানে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। সে সময় অনেকেই খামেনির মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু দেশ যখন বহিরাগত হামলার মুখে, তখন সরকারবিরোধী আন্দোলন প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এদিকে যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান কঠোর। যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে বলেছিল, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু পরে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ হবে তখনই যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতামূলক একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর ইসরায়েল ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, আলী খামেনির উত্তরসূরি যে-ই হোক না কেন তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘটনাটি যুদ্ধের উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির ঘোষণাকে অনেক বিশ্লেষক দেশটির ক্ষমতা কাঠামোর দৃঢ় অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে যে ইরান কোনোভাবেই পিছু হটার অবস্থায় নেই। তারা নতিস্বীকার করছে না এবং করবেও না।’

একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল। তিনি বলেন, ‘নতুন নেতার নিয়োগ আসলে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে চায়।’ প্রায় দুই দশক ধরেই মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে অনেক ইরানি বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ছেলে হওয়ায় বিষয়টি তার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। কারণ ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর অনেকেই হয়তো চাইতেন না দেশটি আবার শাহদের আমলের মতো বংশানুক্রমিক শাসনের দিকে ফিরে যাচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হোক। কিন্তু সানাম ভাকিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার ভাষায়, ‘এখন ব্যবস্থাটি ধারাবাহিক প্রতিরোধের বার্তা তুলে ধরতে চাইছে। সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর এবং রাষ্ট্র যখন অস্তিত্বগত হুমকির মুখে, তখন মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনা মূলত ক্ষমতা কাঠামোর সমষ্টিগত স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।’

মোজতবা খামেনি সংঘাতের দিকে পরিস্থিতি গড়ানোর পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে অনেক সংবেদনশীল তথ্যের নাগাল পেয়েছিলেন বলে মনে করছেন কাতারভিত্তিক আল-শাবাকা পলিসি নেটওয়ার্কের বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান। তার ভাষায়, ইরানের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসে মোজতবা খামেনি এখনো মধ্যম পর্যায়ের আলেম হিসেবে বিবেচিত। এমনকি এখনো আয়াতুল্লাহ উপাধি পাননি। এ উপাধির জন্য উচ্চতর ধর্মীয় স্বীকৃতি ও যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। বিশ্লেষকের ধারণা, নিকট ভবিষ্যতে তাকে এ উপাধি দেয়া হতে পারে।

তবে মোজতবা খামেনিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির নেতৃত্বের খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। ক্ষমতার অবশিষ্ট কাঠামোর মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোহরে খারাজমির মতে, রাষ্ট্রের জটিল কাঠামো সম্পর্কে গভীর ও পরিশীলিত ধারণা রয়েছে মোজতবা খামেনির। তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, গোয়েন্দা সংস্থা, সরকার ও মন্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। ফলে তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়, যিনি দেশকে স্থিতিশীল রাখতে পারবেন, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বজায় রাখতে পারবেন এবং ইরানের নীতিনিষ্ঠ বা প্রিন্সিপালিস্ট শিবির ও সংস্কারপন্থীদের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখতে সক্ষম হবেন।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, রাজনৈতিক সমঝোতার পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে; সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কাও জোরালো হচ্ছে। এ অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও সমুদ্রপথে পরিবাহিত গ্যাস এ পথ দিয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক উৎপাদক তাদের সংরক্ষণ ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত উল্লম্ফনের পেছনে বৈশ্বিক সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাই প্রধান কারণ ছিল। তবে কয়েকটি দেশ কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুদ ব্যবহার শুরু করার ঘোষণা দেয়ার পর বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়। পরবর্তী সময়ে কিছুটা কমলেও দাম এখানো ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তবে তা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিতে পারে। বড় অর্থনীতিগুলোকে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত চাপ, অর্থাৎ স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। জ্বালানি তেলের দামের এ উল্লম্ফনের প্রভাব দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ছে। এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার থমকে যেতে পারে।

এটি ১৯৭০-এর দশকের মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি তেল সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে বলে মন্তব্য করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আরব জ্বালানি তেল উৎপাদক দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে জ্বালানি তেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেক পশ্চিমা দেশে জ্বালানির তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়, পেট্রল স্টেশনে দীর্ঘ লাইন পড়ে এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ সংকট বিশ্বজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং জ্বালানি নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। এর পর থেকেই অনেক দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা ও কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুদ গড়ে তোলার দিকে জোর দিতে শুরু করে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বের অর্থনীতি এরই মধ্যে কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধার, ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং বাণিজ্য উত্তেজনার মতো একাধিক ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করে, তাহলে নতুন এক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে আবারো বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

গোল্ডম্যান স্যাকস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ লর্ড জিম ও’নিল বলেছেন, ‘এ যুদ্ধ এমন সময়ে শুরু হয়েছে যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি নিজেই অস্থির অবস্থায় রয়েছে।’ তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর যে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, তার ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা করা হয়নি।

হামলা-পাল্টাহামলা অব্যাহত: গতকাল ইরান যুদ্ধের দশম দিনেও হামলা-পাল্টাহামলা অব্যাহত ছিল। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা জানায়। ইসরায়েলও নতুন করে হামলার ঘোষণা দেয়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী এক বিবৃতিতে বলে, তারা ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। সিএনএন জানায়, ইরানের রাজধানী তেহরানে বেশ কয়েকটি বড় আওয়াজ শোনা গেছে। বিমান হামলা হলে এমন আওয়াজ হয়।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। রয়টার্সের ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরের দক্ষিণের উপশহরগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে। পৃথক ভিডিওতে দেখা গেছে, বৈরুতের একটি হোটেলে আগুন জ্বলছে।

এছাড়া গতকাল বাহরাইনের প্রধান জ্বালানি তেল শোধনাগারে হামলা হয়েছে। হামলার পর শোধনাগারটির দিক থেকে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। হামলার শিকার বাহরাইন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই তারা চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারছে না।

এছাড়া বাহরাইনের রাজধানীর কাছে ইরানের ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাহরাইন নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থাটি বলেছে, আহত ব্যক্তিদের সবাই বাহরাইনের নাগরিক। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে বড় ধরনের একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চারটি ড্রোন দেশটির একটি বৃহত্তম তেলক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন মরু এলাকায় ড্রোনগুলো প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়। কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, তারা একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখতে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে।

এছাড়া তুরস্কে আবারো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ইরান থেকে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরান থেকে ছোড়া হয়েছে। এটি ইরাক ও সিরিয়ার আকাশসীমা অতিক্রম করে তুরস্কের দিকে আসছিল। পরে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন থাকা ন্যাটোর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা আকাশেই ধ্বংস করে।

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, তার দেশে তুরস্ক, সাইপ্রাস ও আজারবাইজানের ওপর হামলা চালায়নি। গত সপ্তাহে তুরস্ক, সাইপ্রাস ও আজারবাইজানে হামলার যে খবর এসেছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব দেশের বিরুদ্ধে ইরানি ভূখণ্ড থেকে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো হয়নি।

এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার লক্ষ্যে সৌদি আরব সফর করছেন চীনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত ঝাই জুন। চীনের বিশেষ দূত বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অবিরাম চেষ্টা চালাতে রিয়াদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং। চলমান সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার বিষয়ে বেইজিংয়ের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন ঝাই জুন।

আরও